হাওয়া (Hawa) 2022 Full Bangla Movie Review | Chanchal Chowdhury | Nazifa Tushi | Sariful Islam Razz

Please wait 10 seconds...
Scroll Down & Click Get Link
Congrats! Link is Generated

 --- "হাওয়া" --- 

হাওয়া (Hawa) 2022 Full Bangla Movie Review

🎬 Not a masterpieceBut a great effort!

📽️ Honest Review

⚠️ Don't worry.স্পয়লার দিবোনা।

আমি রিভিউটাকে কয়েকটা ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে পয়েন্ট আকারে লিখছি। আশাকরি সকলের বুঝতে সুবিধা হবে।

১এই সিনেমায় অনবদ্য ডিরেকশন ছিলো, সেটা পুরো সিনেমা জুড়েই প্রতিয়মান। সুমন সাহেব যে অক্লান্ত ডেডিকেশন দিয়ে সিনেমাটি তৈরি করেছেন তা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। বাজেটজনিত কোন সমস্যা ছিলো কিনা তা আমার জানা নেই। তবে আমার কেন জানি মনেহয়েছে যে বাজেট যদি আরেকটু বেশি হতো তাহলে সুমন সাহেব তার মুন্সিয়ানা শতভাগ দেখাতে পারতেন। 

২দৃশ্যধারন, সংযোজন এবং কালার গ্রেডিং চমৎকার ছিলো। দেখে বুঝাই যায় পটু হাতের কাজ। এই সিনেমাটা সম্পূর্ণরূপে সাগরের মাঝে একটা ট্রলারে ধারন করা হয়েছে। কিন্তু এই পুরো ঘটনা একটা ছোট্ট পরিসরের মধ্যে হলেও সুন্দর সিনামাটোগ্রাফির কারনে সেটা একবারও মাথায় আসেনি এবং বোরিং লাগেনি। তাই সিনেমার এই সেক্টরটা প্রশংসার দাবিদার।

৩ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছিলো অসাধারন। যেহেতু ডিরেক্টর সুমন সাহেব নিজেই একজন ব্যান্ডের সদস্য তাই এই সেক্টরটা নিয়ে যে তিনি যথেষ্ট যত্নশীল ছিলেন সেটা পুরো সিনেমাজুড়ে প্রতিয়মান।

৪কস্টিউম ডিজাইন এবং মেকাপ ছিলো প্রশংসনীয়। প্রত্যেককে দেখতে এদকম খাটি জাইল্লা মনেহচ্ছিলো। আর এই কারনের গল্পের ভেতরে ঢুকে চরিত্রগুলোকে বুঝে নেয়াটা অনেক সহজ হয়েছে।

৫ডায়ালগ ডেলিভারি ছিলো একেবারে Raw টাইপের। কথার ভাজে-ভাজে প্রচুর গালিগালাজ ছিলো। কিন্তু সত্যি বলতে এই গালিগুলো গল্পের প্লট এবং চরিত্রের সাথে মানানসই লেগেছে। কারন এটা জেলেদের কাহিনী। গালিগালাজ ব্যাপারটা ওদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তাই যদি গালি বর্জিত ভাষায় কথা বলা হতো সেখানে "জাইল্লা-জাইল্লা" ভাবটা আসতো না।

৬অভিনয়শিল্পীরা প্রত্যেকেই নিজ-নিজ চরিত্রে সেরাটুকুই দিয়েছেন। চঞ্চল চৌধুরি জাত অভিনেতা, তাকে নিয়ে কিছু বলার যোগ্যতা আমার নেই। ওনাকে বাদ দিয়ে যদি চিন্তা করি, তাহলে ২জন ব্যক্তির কথা বলতেই হয়। তারা হলেন নাসির উদ্দিন খান এবং শরিফুল রাজ। এই দুই অভিনয়শিল্পী ভাল-ভাল কাজের সুযোগ পেলে অনেক উচ্চতায় পৌঁছাবেন বলে আমার বিশ্বাস।

৭গল্পের ধারা কিংবা স্টোরিলাইন নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়, যেটা নিয়ে আমার খানিকটা অসন্তুষ্টি আছে। এটা নিয়ে আমি কিছু constructive criticism এর চেষ্টা করছি।

প্রথমার্ধঃ

সিনেমার প্রথমার্ধ যথেষ্ট Slow! যারা এই ঘরানার সিনেমা দেখে অভ্যস্ত নন তাদের খানিকটা বিরক্তি ধরতে পারে। এই প্রথমার্ধে চরিত্রগুলোর সাথে দর্শকদের পরিচয় করানো হয়। কিন্তু গল্পে প্রভাব বিস্তারের মতো উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই দেখানো হয়না। এতটা ধীরে-ধীরে না এগিয়ে আরেকটু গতি বাড়ানো যেতো। চাইলে এই ধীরগতির সময়টা কে কাজে লাগিয়ে গল্পে প্রভাব বিস্তারকারী কিছু চরিত্রের back story এবং in-depth এ যাওয়া যেতো, যেটা এখানে একদমই করা হয়নি। তাহলে দর্শকরা চরিত্রগুলোকে আরো ভালভাবে অনুভব করতে পারতো এবং গল্পের গতি বাড়তো।

দ্বিতীয়ার্ধঃ

অতঃপর দ্বিতীয়ার্ধে এলো। যেখানে থ্রিলার এবং মিথোলজি আসতে শুরু করে। গল্পের মোড় ঘুরতে থাকে। এই জায়গায় যেই জিনিসটার অভাব বোধ করেছি সেটা হলো Suspence!

চঞ্চল চৌধুরির চরিত্রে আরো সাসপেন্স যুক্ত করার সুযোগ ছিলো। যেটা "হাওয়া" টিম মিস করেছে।

৮গল্পের সমাপ্তি কিংবা Ending:

একটা সিনেমার Ending খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এই জায়গায় "হাওয়া" ব্যর্থ হয়েছে।

নাজিফা তুষির চরিত্রের আড়ালে একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু এই রহস্যটা অধিকাংশ দর্শক অনুভব করতে পারেনি বলে আমার মনে হয়েছে। এর মূল কারন ছিলো তার চরিত্রের in-depth এ না যাওয়া, গল্পের মিথোলজিকাল এসপেক্ট গুলোর in-depth এ না যাওয়া। দর্শক তুষি এবং চঞ্চলের চরিত্রের সাথে পরিপূর্ণভাবে কানেক্টেড হওয়ার সুযোগ পায়নি। এ কারনেই সিনেমার ending-টা অধিকাংশ মানুষ পুরোপুরিভাবে অনুভব করতে পারেনি বলে আমার মনে হয়েছে। গল্পের ধারাটা কোনদিকে মোড় নিচ্ছে এবং কেনো নিচ্ছে এ নিয়ে অনেকেই বেশ কনফিউজড ছিলো, সেটা লক্ষ্য করলাম। এই গল্পের অন্তরালে সেই মিথোলজিকাল এসপেক্ট গুলা রয়েছে সেগুলাকে আরো সাসপেন্সফুল এবং ড্রামাটিক ভাবে তুলে ধরা যেতো। এই জায়গাটায় আরেকটু এফোর্ট দিলে সিনেমার শেষের দিকটা অনেক বেশি উত্তেজনাপূর্ণ হতো এবং গল্পটা দর্শকের মনে দাগ কাটতো বলে আমার বিশ্বাস। 

৯পরিশেষে এটাই বলবো।

সবাই হলে গিয়ে সিনেমাটি দেখুন। আপনার পয়সা লস হবেনা। একজন মেধাবী ডিরেক্টর বাংলা সিনেমার এই দুর্দশাগ্রস্ত দিনে সাহস এবং পরিশ্রম দিয়ে তার প্রথম সিনেমাটি বানিয়েছেন। কিছু অপরিপূর্ণতা তো থাকবেই। কিন্তু সেসব বাদ দিয়ে চিন্তা করলে "হাওয়া" একটি চমৎকার সিনেমা। সিনেমাটি দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে পরিবর্তনের একটা দমকা হাওয়া এনে দিয়েছে। এটা একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে মানসম্মত কাজের এই হাওয়া ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখুক।

My Rating: 7/10

Happy Watching❤️❤️❤️

"হাওয়া"র যবনিকা উত্তোলন ও পতন।

(স্পয়লার এলার্ট)

“এই দরিয়ায় আমিও দুইবার মইরা গেছিলাম, আমার লগেরগুলা মইরা ভূত হইয়া গেছে...আমি বাঁইচা গেছি।”

এই ডায়ালগটা যে মুভির একটা জটিল অংশ বিশ্লেষণ করে দিয়েছে এটা আমি নিজেও প্রথমে ধরতে পারি নাই।

এখন চলে যাই মুভির শুরুর দিকের কথায় । শুরুর দিকে একেবারেই আমাদের দেশের জেলেদের সাধারণ জীবনচিত্র পরিচালক আমাদেরকে দেখিয়েছেন এবং যথেষ্ট সময় নিয়েই দেখিয়েছেন- তাদের ভালো দিক, মন্দ দিক, রসবোধ ইত্যাদি; যেটা অনেকের কাছে স্লো মনে হয়েছে কিন্তু আমার কাছে একদমই খারাপ লাগে নি। ক্যারেক্টার বিল্ড আপ করার জন্য এই সময়টুকু নেওয়ার দরকার ছিলো।

মুভির বাকি অংশ নিয়ে কথা বলার আগে আমি দুটো বিষয় নিয়ে একটু কথা বলবো।

ওয়াটার মিথোলজিতে অনেক ক্রিয়েচারের কথা বলা আছে । কিন্তু এই মুভির একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্যারেক্টারের সাথে তিনটি ক্রিয়েচার ‘Rusalka’, ‘Merpeople’ এবং ‘Leviathan’ এর মিল পাওয়া যায়। যদিও পুরোটাই মেটাফোরিক। এই তিনটা ক্রিয়েচারের হালকা একটু বর্ণনা দিয়ে দিচ্ছি, হয়তো আপনারাই বিষয়টা ধরতে পারবেন...

•Rusalka : স্ল্যাভিক মিথোলজিতে বলা হয় এরা হলো তরুণীদের আত্মা যাদের মৃত্যু অস্বাভাবিক ছিলো। কেউ বর্ণনা করেন তরুণীদেরকে মেরে ফেলা হয়েছিলো অথবা তারা আত্মহত্যা করেছিলো তাদের প্রেমিকদের জন্য। তারপর তারা সমুদ্রের দেবী হয়ে যায়।

•Merpeople : এরা আশ্চর্য সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলো এবং মানুষের রূপ নিতে পারতো। জেলে, নাবিকদেরকে প্রলুব্ধ করার ক্ষমতা ছিলো তাদের। (Merpeople এর একটি ছবির সাথে আমার ব্যবহৃত হাওয়া'র নিম্নোক্ত পোস্টারটির মিল পাওয়া যায়।যদিও এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা )

•Leviathan : এরা সমুদ্র সর্প ; যাদেরকে বিশৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে ধারণা করা হয়। আবার আধুনিক হিব্রুতে leviathan মানে হলো তিমি। ( মুভিতে অনেকবারই পানির নিচে তিমি জাতীয় কোনো মাছ বা তিমি মাছের আনাগোনা দেখা গেছে)

ইনুইট উপকথায় ‘সেডনা’ হলো সমুদ্রের দেবী। সমুদ্রের সব প্রাণীরা তাকে মান্য করে। তার আদেশে জেলেদের জালে মাছ ধরা দেয় আবার দেয় না , আবহাওয়া পরিবর্তন হয়।

এখন আসি দ্বিতীয় বিষয়টাতে। অনেকে হয়তো ‘ষড়রিপু’ সম্পর্কে জানেন। তবু একটু বলে নিচ্ছি - মানুষের মানবীয় গুণাবলি ধ্বংস করার জন্য দায়ী ৬ টি কাঁটা বা শত্রু হচ্ছে এই ষড়রিপু । এগুলো হচ্ছে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ (অহংকার) ও মাৎসর্য্য (হিংসা)। 

 

নারী ও পুরুষ একে অপরের প্রতি যে আকর্ষণ অনুভব করে সেটাই কাম। কিন্তু এই কাম যখন অনিয়ন্ত্রিত হয় তখন সেটা একজন মানুষকে চরিত্রহীন করে, সমাজকে দূষিত করে। 

বাকি পাঁচটি রিপু আমরা সবাই বুঝি এবং এগুলো পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত।

এখন মুভিতে ফিরে আসা যাক....

নৌকায় একটা প্রাণী আগমনের আগে মানুষগুলোর চেহারা আর পরে মানুষগুলোর চেহারার ব্যাপক তফাৎ। চরিত্রের দোষগুলো...এক কথায় ষড়রিপু প্রবলভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আর সেই প্রাণীটি হচ্ছে একজন 'নারী' ; সেই রহস্যময়ী গুলতি (তুষি)।

 গুলতি যখন জালে ধরা পড়ে তখন নাগু (নাসির উদ্দিন খান) বলে এটা তো মাছ! যদিও তার এই ভুলভাল দেখা নিয়ে বাকি সবাই ঠাট্টা করে। কিন্তু নাগু গুলতিকে মাছ হিসেবে দেখে নাকি নেশার ঘোরে থাকার জন্য আবোলতাবোল বকে সেই প্রশ্নটা থেকে যায়। 

প্রথমে দেখা যায় গুলতি কথা বলতে পারে না, তার এই কথা বলতে না পারাটা তার প্রতি জেলেদের মনোযোগকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায় এবং রহস্য তৈরি করে। এক পর্যায়ে দেখা যায় চান মাঝি (চঞ্চল চৌধুরী) গুলতিকে হ্যারেস করতে চায়, তখন আমরা দেখি গুলতির এগ্রেশান, এরপর একবার নাগুও খারাপ উদ্দেশ্যে গুলতিকে কাছে টানতে চায়, তখনও সে প্রতিবাদ করে, গুলতির এই আচরণের পর থেকেই তাদের চরিত্রে বিশাল পরিবর্তন দেখা যায়, ষড়রিপুর বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট হয়। এরই মধ্যে চান মাঝিদের নৌকায় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে থাকে...নোঙ্গর খুলে যাওয়া, একেবারেই কোনো মাছ না পাওয়া,আবার হঠাৎ জালে অনেক মাছ ধরা পড়া, ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং জেলেদের নিজেদের মিথ অনুযায়ী সবকিছুর পিছনে গুলতিকে দায়ী করা অর্থাৎ চান মাঝির ভাষায় যা কালাযাদু!

একমাত্র ইব্রাহীম(শরিফুল রাজ) অন্যদের থেকে আলাদা হওয়ার জন্য গুলতি তার মায়ায় পড়ে যায় এবং সে যে কথা বলতে পারে সেটা ইব্রাহীমের কাছে ধরা পড়ে। চান মাঝি তার বাবাকে হত্যা করেছে এবং সে চান মাঝিদের নৌকা ডুবিয়ে বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চায় এসব কথা বলে। গুলতি নিজে যে একটা আনন্যাচেরাল ক্যারেক্টার সেটাও ইব্রাহীমকে বলে । আনন্যাচেরাল হওয়ার কারণেই হয়তো আমরা গুলতিকে প্রায় প্রায়ই হাওয়া হয়ে যেতে দেখেছি!

গুলতি-ইব্রাহীমের সখ্যতাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়ে যায় চরম বিশৃঙ্খলা, চান মাঝির হাতে ইব্রাহীমের মৃত্যু, গুলতির আবার হাওয়া হয়ে যাওয়া, একে একে অন্য জেলেদের রহস্যজনক মৃত্যু এবং ইব্রাহীমের লাশ ফেলতে যাওয়ার সময় সাপের ছোবলে চান মাঝি ও নাগুর মৃত্যু।

এখানে সাপ দেখানোর পরপরই আবার গুলতিকে ইব্রাহিমের লাশের সাথে দেখতে পাওয়াটা কিছু প্রশ্ন তৈরি করে..গুলতিই কি সাপ? নাকি বেদে গুলতির সাথেই সাপটি ছিলো? সেটা ভাববার বিষয়। আর এখানেই একেবারে প্রথমে উল্লিখিত সেই ডায়ালগটা প্রয়োগ করার সময়! “আমার লগেরগুলা মইরা ভূত হইয়া গেছে, আমি বাঁইচা গেছি” এই বেঁচে যাওয়া মানুষ হিসেবে বাঁচা না, এই বেঁচে যাওয়া হতে পারে অন্য ‘রূপে’ বাঁচা...যেভাবে গুলতি বেঁচেছিলো! 

তবে শেষ দৃশ্যে ভালোবাসার যে একটা অদ্ভুত অনুভূতি পাওয়া যায় সেটি লেখার ভাষা আমার জানা নাই।

তো.এখানেই যবনিকা পতন।

হাওয়া (Hawa) 2022 Full Bangla Movie Review

মুভির সিনেমাটোগ্রাফি, বিজিএম,কালার গ্রেডিং, প্রত্যেকের এক্টিং নিয়ে আলাদা করে কিছু বলছি না , অনেকেই এ বিষয়ে বলেছেন । শুধু বলবো এমন সিনেমাটোগ্রাফি আর এক্টিং হলে কোনো মুভি আমি সারাদিন মুগ্ধ হয়ে দেখে কাটিয়ে দিতে পারবো!

সবশেষে ছোট্ট আরেকটা কথা বলতে চাই..চঞ্চল চৌধুরীরই অভিনীত আমার অন্যতম প্রিয় একটি মুভি হচ্ছে “দেবী”।

এই “দেবী”র সাথে “হাওয়া”র কোনোই মিল নেই... কিন্তু, কোথাও যেনো খুব বেশি একটা মিল আছে....

( গ্রুপে এটি আমার প্রথম রিভিউ। ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন আশা করছি)

হাওয়া রিভিউ (No Spoiler)

আমার সাথে নাও মিলতে পারে আপনার মত, আমার মতামতকে সম্মান করার চেষ্টা করবেন 🙂

নেগেটিভ দিক:

১মহা বোরিং স্ক্রিনপ্লে। সাদা সাদা কালা কালা গান পপুলার না হলে এ মুভি ব্যাবসাসফল হতো নাকি আমি শিউর না। গল্প খুবই সিম্পল রিভেঞ্জ টাইপ, সাথে একটু ফ্যান্টাসি এলিমেন্ট আসে। অনেক সময় গল্প সিম্পল হলেও স্ক্রিনপ্লের জন্য কাজ করে যেটা আমার জন্য একেবারেই কাজ করেনি। 

২এন্টারটেইনমেন্ট ভ্যালু। এর চেয়ে বেশি বিনোদন বোধহয় দিন দ্য ডে তে ছিল, আশা করি বুঝতে পারছেন কোন সেন্সে বলছি। পুরো মুভিতে শুধু সাদা সাদা কালা কালা গান, নাইকার সাথে জোরাজোরি আর গালি দেওয়ার সময়ই বুঝা যাচ্ছিলো মাস অডিয়েন্স ইঞ্জয় করছে। এগুলো তো মুভির সেলিং পয়েন্ট হতে পারেনা। এই মুভির টার্গেট অডিয়েন্স ও তারা ছিলোনা সম্ভবত। কিন্তু তারা গেলেও তো মেকার্সরা মাইন্ড করবেননা। ঐ যে সাদা সাদা কালা কালা ইফেক্ট।

৩ক্যারেক্টার রাইটিং। বেশির ভাগ সাপোর্টিং ক্যারেক্টারই কোনো ইম্প্যাক্ট ফেলতে পারেনা। তার মানে ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট ভালো হয়নি। শরিফুল রাজ, তাকদিরের মন্টুর চরিত্র কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি। শুধু চঞ্চল চৌধুরী, তুষির চরিত্রের আর্ক আমার ভালো লেগেছে।

পজিটিভ দিক:

১সিনেমাটোগ্রাফি দুর্দান্ত। যেভাবে শুট করা হয়েছে তা ইন্টারেস্টিং ছিলো। 

স্ক্রিনপ্লে অবশ্যই কিছু জায়গায় আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, স্পেশালি পোস্ট ইন্টারভাল আর ফাইনাল এক্ট। তবে তা খুবই কম সময়ের জন্য। এতেই বুঝা যায় মেকার্স মিসড দ্য মার্ক।

২আমি জানতাম চঞ্চল চৌধুরী ভালো অভিনেতা, তবে নাটক ছাড়া তার কোনো কাজ দেখা ছিলোনা। সত্যিই দারুণ অভিনেতা এবং মুভির সবচেয়ে স্ট্রং পয়েন্ট। আর পরাণ সিনেমার পুলিশ, আমি তার নাম জানিনা দুঃখিত। আমি তার চরিত্রকে ঘৃণা করছি এঞ্জয়ও করছি, তার মানে সে ভালো কাজ করেছে। তুষিকে 'ক্লোজ আপ কাছে আসার গল্প' এর নাটকে দেখছিলাম কারণ আমি শাওনের ফ্যান। সত্যি বলতে সেখানে তার কাজ আমার পোষায়নি, যা হাইপ ছিলো সেখানে তাকে নিয়ে আমি মনে করি ওভাররেটেড ছিলো। এখানে তার কাজ ইম্প্যাক্ট ছাড়ে এবং আমার তাকে ভালো লেগেছে

 ৩কনসেপ্টটা অবশ্যই এদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন ছিলো। স্ক্রিনপ্লে আর ক্যারেক্টার রাইটিং ভালো হলে দারুণ একটা মুভি হতে পারতো। মেকার্সদের এফর্ট অবশ্যই এপ্রিশিয়েট করি। পারসোনালি আমার জন্য মুভিতে তেমন কিছু ছিলো, বোরই হইছি মোস্ট অব দ্য টাইম।

Personal rating 2/5

হাওয়া (Hawa) রিভিউ

পার্সোনাল রেটিংঃ ৯/১০। 

স্পয়লার এলার্ট!!!

আমি প্রধানত দুইটি কারনে হাওয়ার ব্যাপারে খুব আগ্রহী হয়ে উঠি - প্রথমত, "সাদা কালা" গানটি আর দ্বিতীয়ত, এর অনন্য সুন্দর পোস্টার। যখন ট্রেইলার দেখলাম তখন ছবিটাকে আরও ইন্টারেস্টিং মনে হল। মনে হয়েছিল বাংলা ছবির ইতিহাসে দারুন একটা কিছু হতে যাচ্ছে। ছবিটি বাংলাদেশে ২৯ জুলাই মুক্তি পেলেও ক্যানাডায় ২ সেপ্টেম্বর মুক্তি পায়। ফলে অনেকদিন অপেক্ষার পালা শেষ করে ছবিটি দেখে ফেলি সাথে সাথেই।

কাহিনী সংক্ষেপঃ

হাওয়া হল সমূদ্র-উপকূলবর্তী অঞ্চলের একদল জেলের কাহিনী যারা মাছ ধরতে বিশাল বড় বোট 'নয়নতারা' নিয়ে গভীর সমূদ্রে চলে যায়। মাছ ধরে আবার কিছুদিন পর উপকূলে ফিরে আসে। সেই বোটের সর্দার হল চান মাঝি (চঞ্চল চৌধুরী) যার আছে অপকর্মে ভরা অতীত। আরও রয়েছে ইঞ্জিন মাস্টার ইবা (রাজ), নাগু (নাসির উদ্দিন খান), উরকেস, পারকেস, ইজা, মরা ও ফণি। একদিন রাতে রহস্যজনকভাবে তাদের জালে ধরা পড়ল গুলতি (নাজিফা তুষি)। তারা মেয়েটিকে তাদের বোটে আশ্রয় দেয়। মেয়েটিকে দিয়ে চান মাঝি আর নাগু তাদের কুৎসিত কামনা-বাসনা চরিতার্থ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। একই সময়ে নয়নতারার জেলেদের জালে মাছ প্রায় ধরা পড়ছিল না বললেই চলে অথচ অন্য বোটের জেলেরা প্রচুর পরিমানে মাছ ধরতে পাচ্ছিল। গুলতি আর ইবার মধ্যে রোমান্টিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। গুলতি ইবাকে বলে যে সে আসলে এসেছে তার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে। চান মাঝি তার বাবাকে হত্যা করেছিল তাই চান মাঝিকে হত্যা করে সে তার বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিবে। তারপর অল্প সময়ের ব্যবধানে বোটে একজন একজন করে মারা যেতে শুরু করে। শেষে চান মাঝিসহ বোটের সবাই মারা পড়ে।

কাহিনীঃ

কাহিনী একেবারে সহজ-সরল। বুঝতে কোন বেগ পেতে হয়না। ফলে খুব অল্প সময়েই দর্শক পুরো ছবির সাথে মিশে যেতে পারে।

চিত্রনাট্যঃ

ছবিটাকে অনেকে স্লো বললেও আমার কাছে স্লো লাগেনি। বরং ক্যারেক্টর বিল্ড-আপ করার জন্য যতটুকু সময় নেয়া প্রয়োজন ঠিক ততটুকু সময় নেয়া হয়েছে। দর্শক পরের দৃশ্যে বা সিকোয়েন্সে কি ঘটবে তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবে। অবশ্য এটা ঠিক এই ছবি যারা বানিজ্যিক মার মার- কাট কাট ছবি দেখে অভ্যস্ত তাদের জন্য না। আপনাকে একটু ধৈর্য নিয়ে দেখতে হবে। তাহলেই ছবির আসল মজা আপনি বুঝতে পারবেন। তখন মনে হবে আপনার সামনেই মাঝ সাগরে ঐ বোটে যত ঘটনা ঘটছে। এখানেই চিত্রনাট্যের সার্থকতা। দু'টি গানের ব্যবহার ছবিতে অত্যন্ত সময়োপযোগী ছিল। আর অনেকে গালাগালি নিয়ে অনেক অভিযোগ করেছেন। আমার মনে হয়েছে এমন গালাগাল জেলেরা নিজেদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবহার করে থাকে। তাই ছবিতে গালাগালি তেমন উৎকট মনে হয়নি। তবে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে হলে না যাওয়াই ভাল।

পরিচালনাঃ

পরিচালনায় মেজবাউর রহমান সুমন একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছেন। উপকূলবর্তী জেলেদের মধ্যে চালু থাকা বহু পুরনো মিথ, চাঁদ সওদাগর আর মনসা দেবীর কাহিনীর সংমিশ্রণে মিস্ট্রি হরর জনরার হাওয়া ছবিটি নির্মাণ করেছেন। এমন প্রয়াস বাংলা ছবিতে আসলেও বিরল। পরিচালক শুধু বাহবা পাওয়ার যোগ্য নন, একটা স্যালুটও উনার প্রাপ্য। একেবারে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে অন্য লেভেলের একটা নির্মাণ। অনেকদিন দর্শকের মনে রাখার মত একটি ছবি। POV-এর ব্যবহারও অনেক সুন্দর করেছেন। বিশেষ করে, নাগু যখন গুলতিকে নেশার ঘোরে একটা বড় মাছ হিসেবে দেখে। আর পারকেসের অদূরে জাহাজ দেখতে পাওয়ার হ্যালুসিনেশন। চমৎকার। সবচেয়ে অবাক করা যে বিষয়টা হচ্ছে সিনেমাটা দেখা শেষেও আপনি চিন্তা করতে বা আলোচনা করতে বাধ্য আসলে কে ছিল এই গুলতি। ছবিটাতে মিথলজির ব্যবহার করে গুলতিকে একটা রহস্যময় চরিত্র হিসেবে দাড় করিয়েছেন। যার আগমনে পুরুষদের মনে কুৎসিত কাম জেগে উঠে। আর কাম চরিতার্থ করতে না পারে তার উপর অত্যাচারের ঘটনাকে দর্শকরা সহজেই নারীর প্রতি আমাদের সমাজে চলমান সহিংসতার সাথে রিলেট করতে পারবেন। আর আরেকটি বিষয় যেটি দেখাতে চেয়েছেন সেটি হল কর্মফল (Karma)। যারা গুলতির উপর প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে অত্যাচার করেছিল তারা কেউই রেহাই পায়নি। কোন অঘটনের কারন হিসেবে নারীকে Stigmatize করার জন্য উঠেপড়ে লাগা যেন আমাদেরই সমাজে চলা চিরন্তন রীতির প্রতিচ্ছবি।

আমার মনে হয় সুমনই হতে পারবেন আমাদের বাংলা ছবির রেনেসার অগ্রদূত। উনার দ্বারা উজ্জীবিত হয়ে অনেকেই এমন নির্মাণ শুরু করলে বাংলা ছবিতে রেনেসা আসতে বেশি সময় লাগবে না। উনাকে দিয়ে আসলে আগামীতে আরও বড় অনেক কিছু হবে আশা করা যায়। ক্যাপ্টেন মাশরাফির ভাষায়, "তুই পারবি!"

সিনেমাটোগ্রাফিঃ

অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন কামরুল হাসান খসরু। আমার মতে বাংলা ছবির ইতিহাসে সেরা সিনেমাটোগ্রাফির কাজ ছিল এটা। অসাধারণ সব কম্পোজিশন ছিল। ক্যামেরাকে নিয়ে রীতিমতো খেলেছেন তিনি। ক্যামেরাকে ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করানোকে দুর্দান্ত লেগেছে।

এডিটিংঃ

এক কথায় দুর্দান্ত হয়েছে। চিত্রনাট্য যেটা ডিমান্ড করেছে, এডিটিং সেই অনুযায়ী হয়েছে।

মেকাপ আর কস্টিউমঃ

মেকাপ যথেষ্ট ভাল ছিল। কস্টিউম ছিল একেবারে জেলেদের মত। এই দুটো টিমের একটা ধন্যবাদ বিশেষ করে প্রাপ্য।

বিজিএম আর সাউন্ড ডিজাইনঃ

বিজিএম আমার কাছে যথেষ্ট ভাল মনে হয়েছে। বিশেষ করে যখন রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলি ঘটছিল তখন বিজিএম সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে। সাউন্ড ডিজাইন ভাল ছিল।

সংলাপঃ

এই ছবির সংলাপে একটু দুর্বলতা লক্ষ্য করা গেছে। তাছাড়া আঞ্চলিক আর চলিত রীতির সংমিশ্রণও একটু শ্রুতিকটু লেগেছে। সংলাপের গভীরতা কম মনে হয়েছে। সংলাপ আরেকটু ভাল হলে ছবিটি জমে ক্ষীর হত।

CGI:

সিজিআই টেকনোলজির ব্যবহার নিঃসন্দেহে ভাল ছিল। ভাবতে অবাক লাগে খাঁচায় বন্দি পাখিটি বা পারকেসের দেখা জাহাজটি CGI দিয়ে ক্রিয়েট করা।

অভিনয়ঃ

এত ডেডিকেটেড পাল্লা দিয়ে অভিনয় শেষ বাংলা ছবিতে কবে দেখেছি স্মরণে নেই। সবাই দুর্দান্ত অভিনয় করেছে। ফিমেল লিডে তুষি তার চরিত্রের প্রতি অত্যন্ত ন্যায়বিচার করেছেন। পর্দায় তাকে অনেক গ্ল্যামারাস সেই সাথে রহস্যময় লেগেছে। তবে Main Antagonist চরিত্রে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন চঞ্চল চৌধুরী। কি অভিনয় মাইরি! একেবারে লিজেন্ডারি। সবচেয়ে বেশি স্ক্রিনটাইম পাওয়া চরিত্রটাক তিনি একেবারে নিজগুণে ফুটিয়ে তুলেছেন। Antagonist হয়েও পুরো ছবির প্রাণই যেন তিনি। কি তার ডায়ালগ ডেলিভারি, কি তার এক্সপ্রেশন, কি তার এটেনশান টু ডিটেইলস (পানের পিক ফেলা, হাঁটা)। অনবদ্য। হা হয়ে দেখতে হয়। উনার ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয় তো বটেই, বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম লিজেন্ডারি অভিনয়। যারা কারাগারে চঞ্চলের অভিনয় দেখে শিহরিত, হাওয়া মনে হয় তারা দেখেননি৷ না হলে হাওয়াতে তার অভিনয় বেশি আলোচিত বিষয় হত।

নেতিবাচক দিকঃ

এই ছবির সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হচ্ছে গুলতির মোটিভ। মোটিভটা আরেকটু ক্লিয়ার হলে একটু ভাল হত। গুলতির অতীত জীবনের কাহিনীটা বেখাপ্পা আর অসম্পূর্ণ লেগেছে।

পরিশেষে ওয়ান মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন, কে ছিল এই গুলতিঃ

আমার মনে হয় গুলতির চরিত্রটাকে পরিচালক ইচ্ছা করেই রহস্যময় রেখেছেন যাতে মানুষের মনে ভাবনার উদ্রেক হয় আসলে কে ছিল এই গুলতি। আমার মতে গুলতি নিচের যেকোন একটি হতে পারে।

১/ সাধারণ রক্তমাংসের মানুষঃ যে তার বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে কোনভাবে নৌকার জালে ধরা দেয়। যাকে নাগু গাঁজার নেশায় বড় রুপালি মাছরুপে দেখে। জালে মাছ না পাওয়া এবং পরে অনেক মাছ পাওয়া আর ইঞ্জিনরুমে তেলের ড্রাম ফুঁটো হওয়াটা সম্পূর্ন কাকতালীয় যাতে গুলতির কোন হাত নেই। হয়ত সে মজার ছলেই ইবাকে বলেছিল যে তাকে দেবী পাঠিয়েছেন। শেষদৃশ্যে আসলে সে সাপের রুপ ধারন করে না। বরং চান মাঝিই হ্যালুসিনেশনের কারনে গুলতিকে সাপরুপে দেখে কারন এমন কাহিনী সে ছোটবেলা থেকে বাপ-দাদাদের কাছ থেকে শুনে এসেছে। নাগু আর চান মাঝি আসলে সাপের ছোবলে মারা যায়নি, গুলতিই তাদের কোনভাবে মেরেছে। সাপের ছোবলের দৃশ্যটা আসলে একটা মেটাফোর। Karma। ইবাকে ভালবেসে ফেলেছিল বলেই শেষদৃশ্যে ইবার মৃতদেহকে জড়িয়ে ধরে গুলতি নিজেকে সঁপে দেয় সমুদ্রের বুকে। (এই যুক্তিটাই আমার তুলনামূলকভাবে বোধগম্য মনে হয়েছে।)

২/ মনসা দেবী/বহুরূপীঃ এই ক্ষেত্রে তাহলে ধরে নিতে হবে প্রতিটি ঘটনা বাস্তবেই ঘটেছে যেমন, নাগুর বড় রুপালী মাছ দেখা থেকে শুরু করে (এটা অবশ্য নাগু শুধু নেশার ছলে দেখতে পারে। হয়ত গুলতির সাথে এই দৃশ্যের সম্পর্ক নেই) ইঞ্জিনরুমে তেলের ড্রাম ফুঁটো করার ঘটনা, জালে মাছ ধরা না পড়া, হঠাৎ করে আবার মাছ ধরা পড়া এবং শেষ দৃশ্যে সাপের ছোবল ইত্যাদি। একটা দৃশ্যে গুলতি যখন রাতে সমুদ্রে গোসল করে শাড়ি খুলে শুকাতে দিয়ে শরীর মুছছিল, তখন শাড়ীর অন্যপাশ থেকে আমরা দেবীর (মনসা) আবছা ছায়া দেখতে পাই। কে জানে গুলতি দেবীও হতে পারে!

এই যে আপনি ভাবতে আর আলোচনা করতে বাধ্য হবেন গুলতি আসলে কে ছিল এটাই হাওয়া ছবির সার্থকতা। এখানেই মেজবাউর রহমান সুমন আর তার হাওয়া টিম দর্শকের মনে দাগ কাটতে পেরেছে।

পুনশ্চঃ আসুন আমরা ভাল ভাল বাংলা ছবিগুলো বেশি করে দেখি। না দেখেই যেন নেগেটিভ কথা না ছড়াই। কে জানে এই ছবি দিয়েই হয়ত বাংলা ছবি নতুন এক ডাইমেনশানে প্রবেশ করল। হয়ত সুমন বা অন্যান্যরা এর চেয়েও ভাল ছবি নির্মাণ করবেন। আসুন তাদের পাশে থেকে উৎসাহ যোগাই।

সন্তুষ্ট করেছে ' হাওয়া ' সিনেমার প্রচার প্রচারণা...!! 

একটা কথা আছে না যে, ' প্রচারেই প্রসার ' এই কথাটা আসলেই চিরন্তন সত্য। আপনি খুব ভালো মানের সিনেমা বানালেন এবং বিভিন্ন হলেও রিলিজ হলো সিনেমাটি কিন্তু দর্শক জানলোই না যে আপনি সিনেমা রিলিজ দিয়েছেন। এমনটা হলে আপনি যতই ভালো মানের সিনেমা বানান না কেন আপনার সিনেমা কখনই হিট বা ব্যবসা সফল সিনেমা হবে না। কিন্তু যদি সিনেমার প্রমোশনটা ঠিকঠাক হয় তাহলে মানুষ জানবে যে আপনি একটি সিনেমা বানিয়েছেন। ১০ জন জানতে পারলে ২ জন তো অবশ্যই আগ্রহ দেখাবে সিনেমাটি দেখার। তখন ওই ২ জনই আপনার সিনেমাটি দেখে আরো ১০ জন কে দেখতে বলবে। তখনই সিনেমাটি মানুষের কাছে পৌছে যাবে। 

গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক স্ক্রল করতেই চলে আসে হাওয়া টিমের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে করা পারফরম্যান্স এর ভিডিও এবং ছবি । দেখা যায় মেঘদলের 'এ হাওয়া' গানে মাতোয়ারা গোটা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। আবার আরেকটু স্ক্রল করতেই দেখা যাচ্ছে 'সাদা সাদা কালা কালা'র জোয়ারে ভেসেছে বুয়েটের ক্যাম্পাসও। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে 'হাওয়া'র এমন প্রচারণার ধরন বেশ ভালো লেগেছে। 

'হাওয়া' সিনেমার অসাধারণ কনসেপ্ট , মুগ্ধতা ছড়ানো গান, অভিনয়ে এক ঝাঁক তারকা, এসব দেখে এ সিনেমা দেখতে এমনিতেও বহু মানুষ যেতো। কিন্তু, তবুও 'হাওয়া' টিম বসে না থেকে প্রমোশনে নামলো, এবং সেই প্রমোশনে দেখা মিললো নতুনত্বের ছোয়া । রিকশা পেইন্টিং এর মতো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের রং-তুলিতে আনলো নিজেদের সিনেমার পোস্টার। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে গিয়ে অভিনয় শিল্পীরা শিক্ষার্থীদের সাথে একেই সুরে সুর মিলিয়ে গেয়েছে হাওয়ার গান। 

হাওয়া' সিনেমার প্রথম গান 'তুমি বন্ধু কালা পাখি' একদিকে যেমন ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, গ্রাম কিংবা মফস্বলের চায়ের টং এ, পৌঁছে গেছে শহর বন্দর নগরে, কর্পোরেটের ভীড়ে। এটা সম্পূর্ণ আমাদের গান, মাটির গান ও নিজের সংস্কৃতির গান বলেই বোধহয় মানুষের কাছে এই গানের এতটা গ্রহণযোগ্যতা! 

ফেইসবুকে কমবেশি সবার টাইমলাইন' সাদা সাদ কালা কালা ' বা ' এ হাওয়া ' গানেই ভাসছে বার বার। মনে হচ্ছে যেন সারাদেশ মিলেই 'হাওয়া' সিনেমার প্রমোশনে নেমেছে, গোটা দেশেই যেন 'হাওয়া'র উৎসব বইছে!

যাইহোক বাংলা সিনেমার এই খরার সময় ' হাওয়া 'র এরকম প্রচারণা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এরকম প্রমোশনাল স্ট্র্যাটেজি দেখা আসলে চোখের শান্তি এবং মনেরও শান্তি।

# হাওয়া – মুভি রিভিউ

গতকাল দেখে আসলাম বহুল আলোচিত বাংলা চলচ্চিত্র হাওয়া। মেজবাউর রহমান সুমন-এর পরিচালনা করা চলচ্চিত্রটি কক্সবাজারের একটি সমুদ্রগামী নৌকার মাছ ধরে জীবিকা নির্ধারণ করা মাঝি দলের জীবনযাত্রাকে চিত্রিত করে, যেখানে একজন রহস্যময়ী নারীর আবির্ভাব এলোমেলো করে দেয় সবকিছু। পরিচালক বলেছেন চলচ্চিত্রটি একটি রূপকথার গল্পের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে।

> গ্রুপে বড় রিভিউ লিখলে নানান ধরণের তীর্যক সমালোচনা সহ্য করতে হয়, যেগুলো দেখে রিভিউ লেখা ছেড়েছুড়ে দেশান্তরী হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। এদিকে একটা ভালো জিনিস দেখে এসে অনুভূতি শেয়ার না করা পর্যন্ত-ও শান্তি হয় না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, এই ফিল্মের শুধু পজিটিভ আর নেগেটিভ দিকগুলো নিয়েই আলোচনা করবো। তারপর-ও যদি রিভিউটি আপনার কাছে বড় মনে হয়, তাহলে দয়া করে পোস্টটি ইগ্নোর করবেন।

**#সামান্য_স্পয়লার**

# *হাওয়া-র ইতিবাচক দিকগুলোঃ*

* হাওয়া আমার দেখা আমাদের দেশের এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে টেকনোলজিক্যালি সাউন্ড ফিল্ম। এই ফিল্মের ক্যামেরার কাজগুলো অসাধারণ। লাইটের ব্যবহার দেখে মনেই হবে না আদৌ কৃত্রিমভাবে কিছু করা হয়েছে, বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টি বা বিদ্যুৎ চমকের দৃশ্যগুলোর ক্ষেত্রে লাইটের ব্যবহার একেবারে নিখুঁত। চমৎকার করে সাজানো হয়েছে সেট। ফিল্মটি আপনাকে রিয়েলিস্টিক ফীল দিয়েই ছাড়বে।

* চমৎকার হয়েছে রূপসজ্জা বা মেক-আপের কাজ-ও। যে ক’জন অভিনেতা ছিলেন, তাদের মধ্যে একমাত্র নাজিফা তুষি ছাড়া প্রত্যেকে চমৎকারভাবে মানিয়ে গেছেন তাদের চরিত্রে। ফিল্মটি দেখার মধ্যে এক মূহুর্তের জন্য-ও মনে হয়নি যে এরা অভিনেতা, বরং প্রত্যেককেই মনে হয়েছে রিয়াল লাইফ মাঝি।

* অভিনয় ডিপার্টমেন্ট ছিলো টপ-নচ। প্রত্যাশিতভাবেই চঞ্চল চৌধুরী তার “চান মাঝি” চরিত্রে ছাড়িয়ে গেছেন বাকি সবাইকে। অসাধারণ ছিলো সুমন আনোয়ার-এর “ইজা” চরিত্রটি। চঞ্চলের চরিত্রটির পজিটিভ থেকে নেগেটিভ ট্র্যাঞ্জেকশন থাকলেও ইজা শুরু থেকেই নেগেটিভ, তারপর-ও তার চরিত্রের টানাপোড়েন ছিলো দেখার মতো। “উরকেস-পারকেস” চরিত্রে খুবই সাবলীল ছিলেন সোহেল মন্ডল আর রিজভি রিজু। প্রশংসার দাবীদার ছিলো নাসিরুদ্দিন খান-এর “নাগু” চরিত্রটিও।

* ইন্টারভ্যালের পর থেকে গল্প তুমুল গতিতে এগিয়ে গেছে। একপর্যায়ে শ্বাসরূদ্ধকর অবস্থায় ছিলো গল্প। চিত্রনাট্যের পাশাপাশি এখানে চঞ্চল চৌধুরীর অবদান-ও আছে। গুণী অভিনেতা শুরু থেকে গল্পে কোনো ভূমিকা না রাখলেও শেষের দিকে যখন রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হলেন, তখন মনে হলো তিনি একাই এই ফিল্ম টেনে নিয়ে যেতে যথেষ্ঠ।

* আবহ সঙ্গীতের ব্যবহার-ও বেশ ভালো ছিলো। মোক্ষম সময়ে চমৎকার আবহ সঙ্গীত-এর ব্যবহার পেয়েছি।

--------------------------------------------------------------------

# *হাওয়া-র নেতিবাচক দিকগুলোঃ*

* প্রথমেই বলতে হবে সাউন্ডের বিষয়টা। সাউন্ড মিক্সিং-এর কাজ ভালো হয়নি। ডায়লগগুলো স্পষ্ট হয়নি। এটা কতোটুকু ইচ্ছাকৃত, আর কতোটুকু গালিগালাজ লুকানোর জন্য তা জানি না। তবে গালিগালাজে অন্তত আমার কোনো সমস্যা নেই। কক্সবাজারের জেলেসমাজকেই আমরা পর্দায় দেখছি, এটা বোঝাতে গেলে এছাড়া উপায় ছিলো না। তবে প্রথমদিকে কথাবার্তা একেবারে বোঝাই যাচ্ছিলো না, সাউন্ডের অবস্থা এতোটাই খারাপ ছিলো।

* গল্পের মূল অপরাধী চিত্রনাট্য। ইন্ট্রোডাকশন পার্ট ইন্টারভ্যাল পর্যন্ত চলে গেছে। গল্পের পাত্র-পাত্রীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পরিচালক অতিরিক্ত সময় নিয়ে নিয়েছেন, যার ফলে গল্প ঝুলে গেছে। ফিল্মের প্রথম অংশ দেখার পর পরের অংশ কেনো দেখবেন এই নিয়ে আপনি সংশয়ে পড়তে বাধ্য। ফিল্ম আপনাকে পরের অংশ দেখতে টানবে না। এখানে আপনি কোনো স্পেসিফিক বিল্ড-ও পাবেন না, যেটা আপনাকে ইন্টারভ্যালের পরে টেনে নিয়ে যাবে।

* গল্পে সবকিছুই হয় হুট করে। কোনোকিছুই এখানে বিল্ড করা হয় না। হুট করেই জালে মাছ আসা বন্ধ হয়ে যায়, হুট করেই গুলতি-র সাথে ইবা-র প্রেম হয়ে যায়, হুট করেই চান মাঝির পৈশাচিক সত্ত্বা সামনে আসে, আবার হুট করেই বিভিন্ন অলৌকিক বিষয়-আষয় হতে থাকে। গল্পে কমেডি-র প্রবণতা যতো বেশী আছে, সেই তুলনায় বিল্ডের পরিকল্পনা বলতে গেলে নেই। নাগু চরিত্র অন্ডকোষে লাথি খেয়ে ব্যাথা জায়গায় বরফ ঘষে দর্শককে যতোটুকু হাসানোর চেষ্টা করেছে, একেবারে সাডেনলি অলৌকিকভাবে জালে মাছ ওঠা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাকে তার সমপরিমাণ বিচলিত হতেও দেখা যায়নি। অথচ পরেরটারই বিল্ড প্রয়োজন ছিলো।

* ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে নাজিফা তুষি এখনো পর্যন্ত এতোবড় চরিত্র ক্যারি করার উপযোগীই হননি। তার প্রচেষ্টার জন্য সাধুবাদ দিতেই হবে, তবে তার এক্সপ্রেশনে, বডি ল্যাঙ্গুয়েজে, রূপসজ্জায়, সবকিছুতেই ফেইকনেস চলে এসেছে। আমি জানি না গল্পের জন্য তাকে কতোটুকু “ইরি”-ভাবে উপস্থাপণ করার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু যেই মুহুর্ত থেকে গুলতি কথা বলা শুরু করেছে, তখন থেকেই তার মধ্যে বিন্দুমাত্র রহস্য-ও আর অবশিষ্ট ছিলো না। অথচ এই গুলতিই ছিলো হাওয়া ফিল্মের প্রধান চরিত্র।

* শেষে বলবো ফিল্মে অনেককিছু অ্যাড করতে গিয়ে ক্ষতিই হয়েছে। ফিল্মটি না হয়েছে রূপকথা, না হয়েছে থ্রিলার, না হয়েছে পুরোপুরি হরর। চিত্রনাট্য অনুযায়ীই যদি চিত্রগ্রহণ হয়, তাহলে বলতে হবে মূল ঘাপলা চিত্রনাট্যেই। গল্পে প্রথম ভাগে হরর-এর ছিটেফোঁটাও ছিলো না, সহজ সাধারণ জেলেদের সামাজিক গল্প থেকে দ্বিতীয় ভাগে তাতে যুক্ত হয় রহস্য, যেটা শেষের দিকে হরর থেকে আবার ফ্যান্টাসী-তে টার্ণ করে। ফলে ফিল্ম শেষ করার পর প্রশ্ন থেকেই যায়, যে আমি ইহা কি দেখিলাম?

-------------------------------------------------------------------

# আপনি কি হাওয়া দেখবেন?

যদি আপনি বাংলাদেশের নাগরিক হন, আর যদি চলচ্চিত্র দেখে আপনি আনন্দ পান, তবে অবশ্যই আপনার হাওয়া দেখা উচিত। হাওয়া ফিল্মে বেশ কিছু ত্রুটি আছে, তবে একইসাথে টেকনিক্যালি এমন সাউন্ড মুভিও আমাদের দেশে খুবই বিরল। আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী এখন-ও আমরা “কমপ্লিটলি নিখুঁত” মুভি আমাদের দেশে আশা করতে পারি না। কিন্তু টেকনিক্যালি নিখুঁত বা এর ধারেকাছে মুভি বানানোকেও যদি আমরা নিয়মিত বানাতে পারি, তাহলে নিখুঁত মুভি বানানোর খুব কাছেও আমরা যেতে পারবো। এরজন্য হাওয়া বা হাওয়া-র মতো মুভিগুলোকে দর্শক হিসেবে আমাদের সাপোর্ট দিতে হবে।

#ABHC

হাওয়া মুভি রিভিউ: পারসোনাল রিভিউ ৫/১০।  

!!!! স্পয়লার এলার্ট!!!! ১০০% স্পয়লার আছে। যারা মুভি দেখেছেন তারা একটু সাড়া দিলে ভালো হয়। কিছু আলোচনা সমালোচনা করতে চাচ্ছিলাম।

.

১কিছুদিন আগে Sea fog ও দেখছিলাম। গল্প ভিন্ন হলেও হাওয়ার সাথে অনেক চরিত্র ও ঘটনা মিলে যায়। জাহাজের Captain, ইঞ্জিন রুম, টেকনিশিয়ান, প্রেম, নারী, জেলেদের যৌনাচার, নিজেদের মধ্যে দলাদলিতে মৃত্যু। পুরো নকল না হলেও চরিত্রগুলো যে কপি করেছে তা বোঝাই যাচ্ছে। সেটা সমস্যা না। সমস্যা হল গল্পে। 

২আমার কাছে মুভি শেষে মনে হচ্ছিল শুনেছি বুলবুল ঘূর্ণিঝড় এর জন্য হাওয়া টিম আটকে ছিল। এজন্যই কি তাড়াহুড়ো করে গল্প শেষ করে দেয়া লাগছে?? 

.

৩এটা আদিকালের নাগ নাগিনীর মুভির গল্পের মতো হয়ে গেলো না ব্যাপারটা? মানে একবার জীবিত মেয়ে মানুষ আবার উধাও আবার সাপ আবার মেয়ে! মানে কুচ ভি???

.

৪একবার বলল গুলতি হল দেবী, আসছে মানুষরূপে। আবার বলল পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে আসছে। তো গুলতি আগে কি ছিলো, কি হইছিলো তার বাবার সাথে, চাঁনমাঝিই বা কি ছিল এগুলো তো বিস্তারিত দেখাতে পারতো! হয় myth রাখা উচিত ছিল নইলে solid কাহিনী রাখা উচিত ছিল। 

.

৫একটা লোকের দেখলাম মাথায় বটি ঢুকে গেছে। কে মারলো বটি দিয়ে আঘাত? বটি একাই মাথার মধ্যে ঢুকে যায়?? আরেকজন লোক মাছ রাখার বরফের ঘরে গিয়ে এমনেই মরে গেছে। এটা কোন কথা? কি কারণে কেমনে মরল সেটা তো দেখা! তবে তেলের ড্রাম আর জালের ব্যাপারটা ভালো হইছে। টেকনিক্যাল ত্রুটির কারণে এসব হতে পারে। এবং emergency response এর জন্য আমাদের জেলেদের কাছে কোন ওয়াকিটকিও নেই, যেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সত্য। 

.

৬মুভির শেষে ইচ্ছে করলেই আরও Joss এবং Solid ending দেয়া যেত। সেটা হতে পারতো চাঁন মাঝি এবং নাগুর মধ্যে কারো বিশ্বাসঘাতকতা বা খাদ্য-পানীয় সংকটে মৃত্যু বা কোস্টগার্ড এর আগমন বা জলদস্যুর হানা বা একটা দৃশ্যে তিমি মাছ দেখাইছিলো সেই তিমি মাছের ধাক্কায় নৌকা ছিদ্র হয়ে ডুবে যাওয়া এগুলো দেখানো যেতো। এরকম লেজেগোবরে ending দেখে আমি যারপরনাই হতাশ। Mystery রাখতে গিয়ে বিশ্রী বানায় ফেলছে। 

.

চাঁনমাঝির মত আমারও একই কথা : বোটে সাপ আইলো কইত্তে?

**⚠️ Disclaimer:** এটি একটি স্পয়লার ছাড়া রিভিউ। পুরো লেখাটি নন-বায়াসড ভাবে লেখা। ৪ বছর পর মুভি রিভিউ দিচ্ছি। তাই অগোছালো হলে আগেই ক্ষমাপ্রার্থী।

**🌀 Basic Information:**

**➡️ সিনেমাঃ** Hawa - হাওয়া

**➡️ নির্মাণঃ** মেজবাউর রহমান সুমন

**➡️ স্ক্রিপ্টঃ** মেজবাউর রহমান সুমন

**➡️ ডায়ালগঃ** সুকর্ণ শাহেদ ধীমান

**➡️ অভিনয়ঃ** চঞ্চল চৌধুরী, নাজিফা তুষি, শরিফুল ইসলাম রাজ, সুমন আনোয়ার, সোহেল মন্ডল, রিজভী রিজু, নাসির উদ্দিন খান, মাহমুদ আলম, বাবলু বোস (মূলত গোটা সিনেমাতেই ৯ জনকে দেখা যাবে। এছাড়া ৩/৪টি চরিত্রের খুব অল্প কিছু স্ক্রিন টাইম আছে।)

**🗾 Shooting Spot:**

কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, ছেঁড়াদ্বীপ পার হয়েও আরো দুই থেকে তিন কিলোমিটার সমুদ্রের গভীরে গিয়ে শুটিং করা হয়েছে এই সিনেমার।

**📝 Story Line:**

গল্প এক বাক্যে বলে দেয়া যাবে। খুব কঠিন কিছু না। এক শব্দে গোটা সিনেমার স্পয়লার দেয়া সম্ভব। তাই সেই পথে হাঁটছি না। গল্প নিয়েও বেশি কিছু বলবোনা। গল্পে হারাতে হলে এই সিনেমা না। এটি অভিনয় এবং ক্যামেরার কাজ দেখার সিনেমা। এটি একটি মেটাফোরিক্যাল কন্সেপ্টে বানানো সিনেমা।

তবে যদি ব্যাকগ্রাউন্ড বলি তাহলে অনেকটা এমন দাঁড়াবে -

গুলতি ছিল বাংলার অন্যতম বিখ্যাত বেহুলা-লখিন্দর রূপকথার দেবী “মনসা”। তবে “হাওয়া” গল্পটি কিন্তু বেহুলা-লখিন্দরকে নিয়ে নয় বরং মনসা ও চাঁদ সওদাগরকে নিয়ে। আর এই গল্পের চাঁদ সওদাগর আর কেউ নয় বরং আমাদের চঞ্চল চৌধুরীর “চান মাঝি”। এখন অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, মনসা ও চাঁদ সওদাগরের গল্পের মিথোলজীর সাথে “হাওয়া” কিভাবে কানেক্ট হলো? আগেই বলেছি, গোটা মুভিটিই হচ্ছে মেটাফোরিক্যাল।

**📈 Story Build-up:**

*“আরে ভাই চাপেন, চাপেন, সইরা বসেন”*, সিনেমার প্রথম সংলাপ। আপনি এখান থেকেই কানেক্ট হয়ে যাবেন সিনেমার চরিত্র গুলোর সাথে। এরপরে শুধু মাঝি, এজা, নাগু, গুলতি, ইবা, উরকেস, পারকেস, ফনি বা মরাদের সাথে নৌকায় ঘুরে বেড়াবেন গভীর সমুদ্রে। প্রথম অংশে কিছু ডায়লগ ছাড়া খুব আহামরি কিছু ছিলোনা তবে ছিলো বিল্ডাপ। দ্বিতীয় অংশে হুট করে সব কিছু ঘুরে দাঁড়াবে এবং সময়ের সাথে সবগুলো চরিত্র বদলে যাবে।

**📽️ Cinematography:**

এই সিনেমার মূল আলোচ্য বিষয় ২টি। সিনেমাটোগ্রাফি এবং অভিনয়। অভিনয় নিয়ে পরে কথা হবে। বাংলাদেশের সিনেমা জগতে সমুদ্রকে এভাবে করে এর আগে কেউ কখনো দেখেনি।

সুমন পর্দায় যা দেখিয়েছেন তা এক কথায় ছিলো অসাধারণ এবং অনবদ্য। কাজ দেখে বোঝা গিয়েছে প্রতিটি ফ্রেম ধরার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা ক্যামেরা নিয়ে অপেক্ষা করেছেন সিনেমাটোগ্রাফি টিম। বিদ্যুৎ চমকানোর একটি দৃশ্য রয়েছে যা দেখলেই আপনি বুঝে যাবেন ক্যামেরার কাজের মাহাত্ম।

ছবিটিতে পানির গভীরে নোঙরের পিছু নেওয়া ক্যামেরার ক্লোজআপ একটি শট রয়েছে। এরকম শট নেওয়ার জন্য নোঙরের সঙ্গে ক্যামেরা বেঁধে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেওয়া হয়৷ সচরাচর এমন শট আমরা হলিউডের মুভিতে দেখে থাকি।

এগুলো ছাড়াও সমুদ্রের হাওয়ায় শাড়ি ওড়ানোর দৃশ্য, শাড়ি শুকানোর দৃশ্য, সাবান ফেনা দিয়ে খেলা করার দৃশ্য, গভীর সমুদ্রে বাতাসের মাঝে বসে সিগেরেটে আগুন ধরানোর দৃশ্য, পানির নিচে জাল ফেলার দৃশ্য, হাঙর কিংবা ডলফিনের পানির নিচে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য, বিপদের সময়ে বোটের পাটাতনে সবাই মিলে অন্য নৌকাকে ডাকার দৃশ্য, “সাদা সাদা কালা কালা” গানের সময় নাচের পুরো দৃশ্যটা, প্রচন্ড বৃষ্টিতে নৌকার উপরে রাখা খাবার প্লেট গ্লাসের দৃশ্য এমনকি পাখির বসে থাকার দৃশ্যটিও ছিলো অসাধারণ। আমি ইচ্ছে করেই কোন দৃশ্যে কে ছিলো তা লিখলাম না যেনো কেউ স্পয়লার পেয়ে না যায়।

কালার গ্রেডিং, ল্যান্ডস্কেপ শট, গ্রিড লাইন ম্যানেজমেন্ট, সাগরের ঢেউ, পানির রঙ, রাতের দৃশ্য, পানির মাঝে অভিনেতা-অভিনেত্রীর দৃশ্য গুলো এই সব কিছু নিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে রিভিউ লেখা সম্ভব।

সিনেমায় দিনের থেকে রাতের দৃশ্যই বেশি ছিলো। এর বেশ কিছু কারণ আছে। যার একটি হচ্ছে ক্লোজ শট। গোটা সিনেমায় ক্লোজ শটই বেশি ছিলো। হয়তো উত্তাল সমুদ্রের ঠিক মাঝে বার বার যাওয়া এবং শ্যুট করা স্বভাবতই কঠিন ছিলো। একারণেই রাতের দৃশ্য বেশি। সমুদ্রের মত বিশাল ক্যানভ্যাস পেয়েও গোটা সিনেমায় মাত্র চার-পাঁচটি টপ শট আছে। তবে এই শট গুলো আপনার মনে হিমশীতলতা তৈরি করতে বাধ্য। হারিয়ে যাবেন গভীরতায়।

হাওয়া (Hawa) 2022 Full Bangla Movie Review

**🎚️ Background Music:**

“হাওয়া” ছিলো শব্দের খেলা। সমুদ্রের গর্জন কিংবা ঝড়ো বাতাস। শটের পেছনে ভেসে ওঠা মায়াবী এক সুর কিছুক্ষণ পর পর মুগ্ধ করার মতো। কিন্তু অল্প কিছু জায়গায় আমার মনে হয়েছে সাউন্ড কোয়ালিটি আরো ভালো হতে পারতো। সুযোগ ছিলো আরো কিছু সুন্দর মিউজ যুক্ত করার। হয়তো এই কারণে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিককে ১০ এর ভেতর ৮ দেবো। তৃপ্তির জায়গায় একটা ঘাটতি আছে।

**👥 Casting & Acting:**

প্রত্যেকটা চরিত্র তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে অভিনয়ের প্রতি সুবিচার করতে, যেটুকু স্ক্রিন টাইম পেয়েছে তার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে। প্রত্যেককে নিয়ে আলাদা পোস্ট দেয়া যায়। কারো সাধ্য নেই বোঝার যে নৌকার এই লোকগুলো অভিনেতা। মনে হবে তিন পুরুষ ধরে মাছ ধরে আসা জেলে। সকলেই যেন ডুবে গিয়েছিলেন যার যার চরিত্রে।

**🌟 চান মাঝি রূপে চঞ্চল চৌধুরীঃ **চঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম সেরা মেথড এক্টর। তার তুলনা সে নিজেই। চঞ্চলের স্থান কেউ নিতে পারবেনা কখনোই। প্রথম অংশে তাকে নৌকার প্রধান মাঝি বানিয়ে খুব সামান্যই পোর্ট্রে করা হয়েছে। অল্প কিছু কিন্তু চমৎকার ডায়লগ ছিলো। সাথে বোঝা যাচ্ছিলো একটি জাত ক্যারেক্টার বিল্ডাপ হচ্ছে। যতই সময় এগিয়েছে ততই উনি স্বরুপে এসেছেন। চান মাঝির ক্যারেক্টার ডাইমেনশন, তার লেয়ারগুলো একের পর এক সামনে আসতে থাকে আর চমকে যাওয়া লাগে। পান-গুল খাওয়া ময়লা দাঁতে হেসে চান মাঝি জানান দেয় সে ভয় পাবার মতোই মানুষ। চঞ্চল হিরো না ভিলেইন সেটা বুঝতেই অনেকের অর্ধেক সময় পার হয়ে যাবে।

**💫 গুলতি রূপে নাজিফা তুষিঃ** বর্তমান সময়ের আলোচিত অভিনেত্রী। সোশ্যাল মিডিয়ায় যার চোখের চাহনি নিয়ে ঝড়। তার এই গুণের সঠিক বিচার করেছেন পরিচালক সুমন এবং তুষি নিজেই। চোখ এবং বডি ল্যাংগুয়েজ দিয়েই কাত করে দিয়েছেন দর্শকদের। অনেক কিছু না বলেও অনেক কিছু যেন বলে দিয়েছেন তিনি। গুলতী একইসাথে বরফের মতো শীতল-কঠিন, একইসাথে জলের মতো তরল এক চরিত্র। সিনেমায় একটি দৃশ্য ছিলো যেখানে শরিফুল রাজ বলেন তাকে ছিঁড়েখুড়ে খেতে অনেক গুলো পুরুষ উন্মুখ হয়ে আছে যার উত্তরে তুষি বলেন, এইটা জানার জন্য বিশেষ কোনো জ্ঞান লাগেনা - মেয়ে হয়ে জন্মানোই যথেষ্ট। মারাত্মক লেগেছিলো কথাটি। জেলে নৌকার ভেতরে ওঠানামা, চলাফেরায় সাবলীলতা আনাটা যত সহজ মনে হয় তত সহজ নয়। এর জন্য প্রচুর দৈহিক পরিশ্রম ও অনুশীলন প্রয়োজন। নাজিফা এই জায়গাতেই বাজিমাত করেছে। এক কাপড়ে একজন নায়িকা গোটা একটি সিনেমা করে ফেলবে এমনটা মনে হয়না এই বাংলায় কেউ কখনো ভেবেছিলো।

**✨ ইব্রাহীম রূপে শরিফুল ইসলাম রাজঃ** রাজের অভিনয় নিয়ে কথা হবেনা। সে একজন জাত অভিনেতা হয়ে উঠছেন। চমৎকার অভিনয়, বাচনভঙ্গী, দেহ কাঠামো! এইরকমটা বলিউডে দেখা যায়। আমি নাম লিখে তুলনা দিয়ে কাউকে ছোটো বড় করতে চাচ্ছিনা তবে তুলনা দিলে তিনি অনেক উঁচু সারির সাথেই থাকবেন। সামনের দিন গুলোতে শরিফুল রাজ যে ইন্ডাস্ট্রির জন্য বিশেষ কিছু হয়ে উঠবে তারই যেন পূর্বাভাস এই ইব্রাহিম চরিত্র।

**4️⃣ এজা রূপে সুমন আনোয়ারঃ** ওটিটি জগতে সরব বিচরণ তার। বড় পর্দায় চেনাচ্ছেন জাত। দ্বিতীয় অংশে বিশেষ করে প্রথম ৩০ মিনিট চমৎকার কাজ করেছেন তিনি। চান মাঝির পরে নৌকার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।

**5️⃣ & 6️⃣ উরকেস রূপে সোহেল মন্ডল এবং পারকেস রূপে রিজভী রিজুঃ **এই দুজন পর্দায় দুই ভাইয়ের চরিত্রে ছিলেন। স্ক্রিনে তাদের তিড়িংবিড়িং দেখে অবাক হবেন। আবার এগুলোই দিবে বিনোদন। অনেকের হয়তো বুঝতে সময় লেগে যাবে তাদের চরিত্রের বিল্ডাপ। যখন বুঝতে পারবে তখন একরকম ভালো লাগা চলে আসবেই। দুইজনই এই ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ।

**7️⃣ ফনি রূপে বাবলু বোসঃ **বলিউডে বা সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমায় আমরা দেখি শরীরে অঙ্গের নানা রকম ব্যবহার। ফনি তার এক চোখ দিয়ে ফোণা তুলে দিয়েছেন গোটা সিনেমায়। অল্প কথা কিন্তু ইম্প্যাক্টফুল।

**8️⃣ মরা রূপে মাহমুদ আলমঃ** রান্নার মানুষ। মাঝ নদীতে যার দায়িত্ব খাবারের সরবরাহটা ঠিক রাখা। প্রথম অংশে খুব সামান্যই পর্দায় আসলেও দ্বিতীয় অংশে রেখেন দুর্দান্ত প্রভাব।

**9️⃣ নাগু রূপে নাসির উদ্দিন খানঃ** তাকে শেষে আনছি কারণ তিনি অন্যতম সেরা চরিত্র এই সিনেমার। যাকে “এলেন স্বপন” হিসেবেই মানুষ আজকাল বেশি চিনছেন। গালি দিয়েও যে ক্যারেক্টার হিট করা যায় তা এতোদিন ছিলো হলিউড বা বলিউডে। এখন দেখবেন বাংলায়। চরিত্রটিতে দর্শককে একই সাথে আনন্দ এবং বেদনা দিয়েছেন নাসির উদ্দিন খান। তাঁর কথাবার্তায় সিনেমার প্রথম অর্ধেকে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছে গোটা হল। পরের অর্ধেকেই একই লোক হয়ে গেল সারভাইভালিস্ট, স্রেফ বেঁচে থাকার আকুতিতে ছটফট করা লড়াকু এক ব্যাক্তি।

**👊🏻 Punch Line:**

চঞ্চলের ভয়ার্ত চেহারা এক্সপ্রেশন *“ভয় পাচ্ছিস”*? এই একটা সংলাপ, এভাবে দেয়ার ক্ষমতা শুধু মাত্র চঞ্চল চৌধুরীরই আছে। দুই শব্দের সংলাপের মাধ্যমে দর্শকের মনে ভয় ঢুকানো তার দ্বারাই সম্ভব। এছাড়া “টাট্টিখানায় যাবে” বা নাগুর বেশ কিছু ডায়লগ মাথায় গেঁথে যাবে।

**💬 Opinion:**

সমুদ্রযাত্রা বা সমুদ্রকেন্দ্রিক সারা পৃথিবীতে অনেক সিনেমা তৈরি হয়েছে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের জগতবিখ্যাত উপন্যাস “দ্য ওল্ডম্যান অ্যান্ড দ্য সি” থেকে শুরু করে শরৎচন্দ্রের বহুল পঠিত উপন্যাস “শ্রীকান্ত”, বাংলা সিনেমা ‘গাঙচিল’ (পরিচালনা রুহুল আমীন, অভিনয়ে বুলবুল আহমেদ, অঞ্জনা ও আহমদ শরীফ), ইংরেজি সিনেমা “লাইফ অফ পাই” কিংবা কোরিয়ান ছবি “সি ফগ” এর মতো বাংলাদেশে ২০২২ এর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসা সিনেমার নাম “হাওয়া”। তবে এই সিনেমা তার নিজের মতো, সেলুলয়েডের কবি মেজবাউর রহমান সুমনের দুর্দান্ত নির্মাণ।

এই সিনেমা সবার জন্য না। এবং এতে দোষের কিছু নাই। আমার মনে হয় না মেকাররাও এটা ভেবেছিলেন। “সাদা সাদা কালা কালা” গান এতো হিট না হয়ে গেলে হয়তো সিনেমা হলে মানুষও এতো হতো না। কারণ ঐযে বললাম, এই সিনেমা সবার জন্য না। আমরা তো “অজ্ঞাতনামা” বা “কমলা রকেট” এর মতো সিনেমাও দেখি না। যারা এই জনরা পছন্দ করে তাদের জন্য এটা মাস্টার পিস। তবে এই সিনেমা না দেখলা জাতে ওঠা যাবেনা এই ধারণা যেমন ভুল। তেমনই এই সিনেমার বিরোধিতা করে “কুল ড্যুড” সেজেও বিশেষ লাভ নেই।

এই সিনেমা একটা বেঞ্চমার্ক সেট করে ফেলেছে সবার সামনে। ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির বাইরে এটা এই সিনেমার অন্যতম একটা শক্তিশালী আউটকাম। কোন সন্দেহ নাই যে তরুন মেকাররা এই ছবি বারবার দেখবেন এবং এর টেকনিক্যাল সাইডকে ছাড়িয়ে যেতে চাইবেন।

পছন্দের একটা লেখা তুলে ধরতে চাই।

*“There was a magic about the seaPeople were drawn to itPeople wanted to love it, swim in it, play in it, and look at itIt was a living thing that was as unpredictable as a great stage actor: it could be calm and welcoming, opening its arms to embrace its audience one moment, but then could explode with its stormy tempers, flinging people around, wanting them out”*

*- Cecelia Ahern, The Gift*

শেষে এসে বলবো,

বাংলা সিনেমা পরিবর্তনের “এ হাওয়া” ছড়িয়ে পড়ুক দেশের সব জায়গায়।

-'হাওয়া' 

হালকা স্পয়লার থাকতে পারে

দেখে ফেললাম বহুল আলোচিত ছবি হাওয়া...মুভিটা মুক্তির পরই এর পক্ষে বিপক্ষে অসংখ্য মতামত ছিল...তো মুভিটা দেখে আমার মতামতও কিছুটা মিস্রই...

*অনেকে মুভিটাতে বাজে গালাগালির কথা বলেছেন...ব্যাক্তিগত ভাবে মুভির ক্যারেক্টার ও সিচুয়েশনের সাথে এগুলা খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কোন একটা সিংগেল পজিশনেও কোন ডায়লগ ফোর্সফুল মনে হয় নাই (যেটা অনেকসময় বাংলাদেশের ওয়েবসিরিজ গুলাতে লাগে)। এছাড়া মুভিতে বেশকিছু ভায়োলেন্সও ছিল, বাইরের মুভিতে ১৪+, ১৮+ বিভিন্ন রেস্ট্রিকশন থাকে...এমন কিছু থাকতে পারতো...

*মুভির সবচেয়ে বড় week point এর স্টোরি...ক্যারেক্টরগুলার কোন বিল্ডআপ/ব্যাকস্টোরি ছিল না। সবগুলা ক্যারেক্টর এর না দেখালেও অন্তত শরীফুল রাজ, চান মিয়া ও গুলতির টা দেখানো দরকার ছিল, তাতে ইমোশন টা আরও ভালোভাবে গ্রো করতো...

এমনকি গুলতি যখন তার ছোটবেলার কাহিনী বলছিল তখন ব্যাকস্টোরি কেন দেখানো হলনা তা মাথায় আসে নাই...

* ভিজুয়্যাল দিক থেকে মুভিটা সত্যিই দূর্দান্ত...মুগ্ধ হবার মত অনেক অনেক সিনই আপনি পাবেন...কিছু কিছু সিনের খেত্রে তারা শ্যুটটা কিভাবে করেছিল তা নিয়ে চিন্তায় পড়তে হচ্ছিল...এত এত সিনের মাঝে দুইটা সিন আমার স্পেশালি ভালো লেগেছে...(১) মেয়েটি কে যখন জেলেরা খুজে পায় ; ঝুম বৃষ্টির মাঝে মাছ ধরার সিনটা...আমারও ঠান্ডা ঠান্ডা ফিল হচ্ছিল। (২) দুই ক্যারেক্টার এর নৌকা থেকে সাতরে কোষ্টগার্ড সীপের উদ্দেশ্যে যাবার সিনটা; তাদের মাঝের ভয়, হতাসা, সমুদ্রের বিশালতা সবকিছুই টের পাওয়া যাচ্ছিল

* মুভিতে প্রত্যেকটি ক্যারেক্টর এর অভিনয়ই ছিল দূর্দান্ত ...কোন একটা সিংগেল মূহুর্তেও সিংগেল ক্যারেক্টর এর খুত ধরা যাচ্ছিল না...লাস্ট কবে এমন পারফ্যাক্ট কম্বিনেশন দেখেছি মনে করতে পারছি না...রিয়েলি স্পিচলেস...

আলাদা করে বলতে হয় ছবির মূলপ্রান চঞ্চল চৌধুরী ওরফে চান মিয়ার কথা...তার ভয়েস টোন, হাটা চলা, একপ্রেশন; কোথাও মনে হচ্ছিল না যে বাস্তবে এই মানুষটা এই ক্যারেক্টর না...এতই স্ট্রং

* বাংলা মুভি হিসেবে এর সিনেমাটোগ্রাফি, কালার গ্রেডিং অনেক ভালো ছিল...সাউন্ডডিজাইন, বিজিএম এভারেজ মানের; বাংলা মুভিতে এগুলা নিয়ে উন্নতির অনেক জায়গা আছে...

পরিশেষে বলতে চাই হয়তো আরোও অনেককিছু হতে পারতো, হয়তো অনেক কিছু হয় নাই, কিন্তু এরপরও হাওয়া টিম যা বানিয়ে দেখিয়েছে তা সত্যিই গর্ব করার মত..সবাই হলে যেয়ে মুভিটা দেখুন...বাংলা মুভির দিনবদলের সাক্ষী হতে পারবেন...😊

Movie: Sea fog

Genre: drama, thriller 

IMDB Ratting: 6.8/10

Personal Ratting: 7.5/10

গতকাল থেকেই দেখে আসছি হাওয়া মুভিটা নাকি Sea fog নামক কোরিয়ান একটা মুভির রিমেক। তাই ভাবলাম দেখেই নিই। হাওয়া আসলে এই মুভির রিমেক কিনা।

#হালকা_স্পয়লার

.

ঋণে জর্জরিত একজন সাগরে মাছ ধরা নৌকার ক্যাপ্টেন। তাদের নৌকাটা অনেক বেশি পুরানো হওয়ার কারণে এখন আর আগের মতো মাছও ধরতেও সক্ষম হয়না তারা। এরই মধ্যে সে তার বাড়িতে গেলে দেখতে পায় তার স্ত্রী অন্য পুরুষের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করছে। আর এতে সে অনেক কষ্ট পাওয়ায় নৌকায় চলে আসে, এখন তার আপন বলতে আছে শুধু তার নৌকা আর ওইখানে কর্মরত মানুষগুলো। প্রচন্ড ঋণের মধ্যে থাকায় সবাই এই নৌকা বিক্রি করে দিতে বললেও ক্যাপ্টেন এতে রাজি হয়না।

.

অনেক বেশি ঋণ থাকায় ক্যাপ্টেন অনেক জায়গায় টাকা লোন নিতে চায় কিন্তু কেউ থাকে লোন দেয়না। লোন না পেলেও ক্যাপ্টেন একটা অফার পায় যার মাধ্যমে সে অনেক টাকা পাবে আর কাজটি হলো চীন থেকে কিছু অবৈধ অধিবাসী আসবে আর তাদের সমুদ্রপথে মাছ ধরা নৌকায় তুলে নিয়ে তাদের দক্ষিণ কোরিয়ায় ঢুকিয়ে দিতে হবে।

ক্যাপ্টেনের অনেক ঋণ থাকায় সে বেশি কিছু না ভেবেই এতে রাজি হয়ে যায়। ওই অবৈধ অধিবাসীদের জাহাজ থেকে তারা তাদের নৌকায় তুলে নেয়। ওইখানের একেকজনের একেক স্টোরি ছিলো দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া নিয়ে। একজন যাচ্ছিলো তার ভাইয়ের খুঁজে আরেকজন তার বিচ্ছিন্ন পরিবারের সাথে দেখা করতে। এমনি একেক জনের একেকটা স্যাড স্টোরি ছিলো দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া নিয়ে।

.

ওই অধিবাসীদের মধ্যে একজন মেয়ে ছিলো যার সাথে ওই নৌকার একজন ক্রুর সাথে ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। এমনকি ভালো সম্পর্ক থেকে হয়ে উঠে প্রেমের সম্পর্ক।

ওই অধিবাসীদের নৌকায় তুলার পর থেকে ঘটতে থাকে একের পর এক ঘটনা। তাদের তো কাউকে দেখতে দেওয়া যাবেনা, কেউ দেখে নিলেই বিপদ। পুরোপুরি সিক্রেটলি তাদের নিয়ে যেতে হবে। চলতে থাকে ওই নৌকায় অনেক ক্লাইমেক্সে ভরা কাহিনি।

.

হঠাৎ এক দূর্ঘটনায় ওই নৌকার সব অধীবাসীদের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে বেঁচে ছিলো শুধুমাত্র ওই মেয়েটি যার সাথে ওই নৌকার একজন ক্রুয়ের সম্পর্ক হয়ে উঠে।

সব অধীবাসীদের মৃত্যুর পর মেয়েটি তার জীবন নিয়েও সংশয়ে পড়ে যায়। ঘটতে থাকে ওই নৌকায় একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা।

কি কারণে সব অধীবাসীদের মৃত্যু হয়? কেনইবা ওই মেয়ের জীবন নিয়ে সংশয় ছিলো নৌকার মধ্যে? কি ঘটেছিলো ওই নৌকায়? এইসব জানতে হলে আপনাকে অবশ্যই মুভিটা দেখতে হবে।

.

মুভিটা কোরিয়ান নামকরা কোন থ্রীল মুভি না হলেও ভালোই উপভোগ করেছি আমি। মুভির স্টোরি অন্যসব থ্রীল মুভি থেকে আলাদা। ইউনিক একটা কনসেপ্ট। খুবই ভালো ডিরেকশন, সিনেমাটোগ্রাফি ভালো। সবচাইতে ভালো লেগেছে মুভিটির কালার গ্র‍্যাডিং। ২০১৪ এর মুভির এমন কালার গ্র‍্যাডিং প্রশংসনীয়।

মুভির ক্যাপ্টেনের অভিনয় অসাধারণ। সবসময় একটা সিরিয়াসনেস ও টান টান একটা অনূভুতি ছিলো তার ফেইসে। মুভির অর্ধেকভাগ আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, অনেক ভালো অভিনয় তার। 

মুভির থ্রিলিং সিনগুলো আরো ভালোভাবে প্রেজেন্ট করতে পারতো। মেয়েটির আর নৌকার ক্রু এর সম্পর্কটা আরো সুন্দরভাবে সাজিয়ে করতে পারতো। মুভির স্টোরি অনেক ভালো হলেও প্রেজেন্টেশনে দূর্বলতা দেখা গিয়েছে আমার মতে। তবে উপভোগ করার মতো একটা মুভি। সময় ও সুযোগ হলে দেখে নিতে পারেন।

.

এইবার আসি হাওয়া এই মুভির রিমেক কিনা তা নিয়ে।

না ভাই মানেটা বুঝলামনা। কেন করেন এইসব? নেগেটিভিটি ছড়িয়ে কি আনন্দটা পান আপনারা? 

হাওয়া মুভি কোনভাবেই Sea fog মুভির রিমেক না। শুধুমাত্র নৌকা, বোটে করা মাছ ধরা আর সাগরের মধ্যেই মুভির কাহিনী থাকলে মুভি রিমেক হয়ে যায়না। দুইটা পুরোপুরি দুই কনসেপ্টের মুভি। না আছে স্টোরিতে কোন মিল, না আছে কোন ক্যারেক্টর এর সাথে মিল। যে মানুষ হাওয়া আর Sea fog দুইটা মুভিই দেখেছে সে কখনো বলবেনাযে একটা আরেকটার রিমেক মুভি। কোন মুভি না দেখেই শুধু শুধু নেগেটিভিটি ছড়ালে তা অন্যকথা।

.

সমালোচনা করবেন তো? ঠিক আছে গঠনমূলক সমালোচনা করেন। জাজমেন্ট দিবেন তো? ঠিক আছে আগে মুভিগুলো পুরোপুরি দেখে, বুঝে তারপর জাজমেন্ট দেন। এই চলচ্চিত্র আমাদের! দেশে একটা ভালো সিনেমা হলে ভালো নাম করলে আমাদেরই গর্ব। অযথা নেগেটিভিটি ছড়িয়ে চলচ্চিত্র ক্ষতির পাশাপাশি নিজেও নিজেকে ছোট করছেন। আর কিছু বলার নেই, ধন্যবাদ।

#No_Spoiler

….

‘হাওয়া’ মুভি রিভিউ

[ ট্রেলারে যতটুকু দেখানো হয়েছে ততটুকুই বলা হয়েছে এই রিভিউয়ে ]

...

আমি জানি অনেক পাঠক বন্ধু এখনো ‘হাওয়া’ মুভিটি দেখেন নি। তাই আমি রিভিউয়ের নামে গড়গড় করে মুভির কাহিনী বলে যাবো না। চেষ্টা করব একেবারেই স্পয়লার না দিয়ে মুভিটির ভাল-মন্দ ও ডিরেক্টরের ভিশনের সাথে দর্শক কতটা একাত্ম হলেন তা ব্যাখ্যা করতে। সুতরাং যারা মুভিটি দেখেন নি, তারাও আমার এই লেখাটি পড়তে পারেন।

.

ডিরেক্টর মেজবাউর রহমান সুমন আমাদের ট্রেলারে যা আভাস দিয়েছেন মুভিটি শুরু হয় তেমন করেই। চাঁন মাঝি তার জেলের দল নিয়ে মহাজনের স্টিমার ও জালসহ রওনা হয়েছেন বঙ্গোপসাগরে। মাঝিদের হাতে মোবাইল ফোন আভাস দেয় মুভির সময়কাল বর্তমান সময়েই। মহাজনি নৌকা নিয়ে দরিয়ার বুকে মাছ ধরতে যাবার নিয়মটা খুব সাধারণ। ৮/১০ দিন সাগরের বুকে ঘুরে যত মাছ পাওয়া যায় তা নিয়ে মাঝির দল ফিরবে বন্দরে। মাছ বিক্রির পর মহাজন নিজের ভাগে লাভের বেশি টাকা রেখে বাকি টাকা দেবে প্রধান মাঝিকে। প্রধান মাঝি সেই টাকা থেকে তার দলকে কাজ অনুসারে ভাগ করে দেবেন। শ্রেণী বিভাজনের এই করাল গ্রাস যুগ যুগ ধরে শ্রমিক ও সামন্তকে ভাগ করে রেখেছে। তবে সময়ের সাথে সাথে সদা সরল এই শ্রমিকের দলও শিখে গেছে দুর্নীতি। মাঝ সাগরেই অন্য মহাজনের কাছে কিছু মাছ বিক্রি করে সেই টাকা নিজেরা রেখে দেয় জেলেরা। এছাড়া কক্সবাজার অঞ্চলের মাদক কারবারিদের গোপন পরিবহন হিসেবেও এইসব মাছধরা নৌকা ও মাঝিরা ব্যবহৃত হয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই মাঝ সাগরে এক প্রধান মাঝির আদেশে নৌকার সবাই ইচ্ছে না থাকলেও এসব কাজে জড়ায়। তবে এরমধ্যে যে বিদ্রোহ হয় না তা নয়। মাঝেসাঝে কেউ কেউ টাকার ভাগ নিয়ে প্রতিবাদ করে। সেই প্রতিবাদ ঠান্ডা করাও হয় বেশ সুন্দর করেই।

.

চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত চাঁন মাঝির দলবলটিও এরকম বৈধ-অবৈধ কাজে নানাভাবে জড়িত। তবে এবার ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা। এক ঝড়ের রাতে তাদের জালে উঠে আসে আস্ত এক নারী। প্রথমে তারা মেয়েটিকে মৃত ভাবলেও পরে জানা যায় সে জীবিত। মাঝ সাগরের বিপদ সংকুল পরিবেশে এমন একদল প্রায় বর্বর জেলের জালে উঠে আসা নারীটিকে নিয়ে সেই নৌকায় কি কি হয় তা নিয়েই বাকি সিনেমার গল্প আবর্তিত।

.

২ ঘন্টা ১০ মিনিটের এই অনবদ্য সিনেমাটি বাংলাদেশীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটা ট্রেডমার্ক হয়ে থাকবে। সেই ১৯৯৩ সালে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ মুভির পর এই প্রথম বাংলাদেশের জেলে জীবন নিয়ে এমন অনন্য সুন্দর মুভি নির্মাণ হয়েছে। মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘হাওয়া’ মুভির শতকরা ৯৯% দৃশ্য সাগরের বুকে, নৌকার উপরে, পানির নিচে, সাগরে ডুবে ডুবে চিত্রায়িত হয়েছে। প্রতিটি অভিনেতা তাদের শারিরীক সামর্থের সবটুকু উজার করে দিয়েছেন পারফর্মেন্সে। তবে এই শারিরীক শক্তি খাটাতে গিয়ে কিছু কিছু ভাল অভিনয় শিল্পী নিজেদের অভিনয় দক্ষতা সবটুকু দেখাতে পারেন নি।

.

বিশেষত কয়েকটা দৃশ্যে নাজিফা তুষি ও শরিফুল রাজ রাতের বেলায় স্টিমারের ডেকের নিচে সাগরে গলা পর্যন্ত ডুবে ডুবে অভিনয় করেছেন। নাজিফা তুষি শাড়ি পড়া ছিলেন, রাজ লুঙ্গি পড়া। পানির ঢেউ ও কাপড় সামলে সংলাপের গভীরতা তেমন করে ফুটিয়ে তুলতে পারেন নি তারা। সংলাপের একই হাল হয়েছে যখনই রাতের সিকোয়েন্সে প্রচন্ড ঝড়ো বৃষ্টির মধ্যে অভিনেতারা কথা বলেছেন। আমি জানি বাস্তবতায় বৃষ্টির মধ্যে এবং পানিতে ডুবে স্পষ্ট করে কথা বলা যায় না। কিন্তু সিনেমায় ডায়লগ তো জরুরী। ডাবিংয়ের সময়েও শব্দ গ্রাহকেরা এই ব্যাপারটা উহ্য রেখেছেন। হয়তো পরিচালক রিয়েলিজম রাখার জন্য এমনটা করেছেন কিন্তু ডায়লগ স্পষ্ট রাখা দরকার ছিল আমি মনে করি।

.

এই মুভিতে চঞ্চল চৌধুরী, সোহেল মন্ডল, নাসের উদ্দিন, শরীফুল রাজ, সুমন আনোয়ারের মত বাঘা বাঘা অভিনেতাদের সাথে পাল্লা দিয়ে পারফর্ম করেছেন নাজিফা তুষি। দিন দিন অভিনয়ে পারঙ্গমতা অর্জন করেছেন তিনি । তবে ‘হাওয়া’ মুভিতে নাজিফা তুষির পারফর্মেন্স বের করে এনেছেন চিত্রগ্রাহক কামরুল হাসান খসরু। স্ক্রিপ্টের সিংহভাগ সময়ে তুষির কোন ডায়লগ ছিল না। সুতরাং তার চোখের চাহনি, ঠোঁটের ভঙ্গিমা, ভ্রুক্ষেপ, কোমড়ের বাঁক ইত্যাদিকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নিয়েছেন চিত্রগ্রাহক, সম্পাদক ও পরিচালক।

.

বলা যায় ‘হাওয়া’ মুভি থেকে আমাদের শ্রেষ্ঠ পাওয়া এর সিনেমাটোগ্রাফি। মাঝ সাগরে দিশাহীন ভাসতে থাকা একটা স্টিমারকেও সিনেমার জীবন্ত চরিত্র বানিয়েছে এর ক্যামেরার কাজ। নোঙ্গরের শেকলের সাথে সাথে সাগরের বুকে ক্যামেরা ঢুকে যাওয়া; আমাদেরকেও বাতাস থেকে পানিতে ডুবিয়েছে। এমন ব্রেক থ্রু সত্যিই বাংলা সিনেমার টেকনিকেল এস্পেক্টে বড় সংযোজন।

.

সিজিআই বা ভিজুয়ায়ল গ্রাফিক্সেও বেশ নিপুণতা দেখিয়েছে ‘হাওয়া’। গভীর সাগরে নোঙ্গর ঘুরে আবর্তিত হওয়া মাছ বা দূরে নিঃশ্বাস ফেলা তিমি; ঝড়ে ভিজে কাবু হওয়া শালিক পাখি – কোনটাই সামান্য একটুও নকল মনে হয় নি। আমি দুঃখিত, ভিএফেক্স আর্টিস্টের নামটি বের করতে পারিনি। আপনারা কেউ জানলে কমেন্টে জানাবেন।

.

‘হাওয়া’ মুভির সবচেয়ে শক্তিশালী ও দুর্বল দিক হল এর অতি রিয়েলিজম এপ্রোচ এবং মিথোলজিক্যাল সিম্বলিক অংশগুলো। যারা বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জনজীবনে জড়িত ভাষা, প্রচলিত বিশ্বাস বা কুসংস্কার, বাংলাদেশের পটভূমিতে এসব মাঝিদের সাধারণ ব্যাক স্টোরি সম্পর্কে আইডিয়া রাখেন তাদের কাছে ‘হাওয়া’ একটা মাস্টারপিস। অন্যদিকে যাদের এসব ব্যাকস্টোরি সম্পর্কে আইডিয়া নেই তাদের কাছে এটা বিশাল একটা আন্ডার ডেভলাপমেন্ট। বিশেষ করে ক্লাইম্যাক্সে যা ঘটলো এবং যেভাবে ঘটলো সেই ব্যাপারটা। ভয় নেই, আমি স্পয়লার দিব না। শুধু ব্যাক স্টোরি ও মিথ ব্যাখ্যা করবো, যা জানা থাকলে আপনার ‘হাওয়া’ দেখার এক্সপিরিয়েন্স আরো ঋদ্ধ হবে।

.

আপনারা যারা ‘ন ডরাই’ মুভিটি দেখেছেন তারা নিশ্চয় জানেন “দরিয়ায় মাইয়া ছাওয়াল যাওন নাই” এমন একটা প্রচলিত কুসংস্কার আছে কক্সবাজারের সাধারণ মানুষের মাঝে। কাছাকাছি সংস্কারের ছোঁয়া পাওয়া গেল এই মুভিতেও। “মাছ ধরা নৌকায় মেয়ে মানুষ থাকতে নেই” – জেলেদের মধ্যে এমন বিশ্বাস প্রচলিত হলেও; নৌকায় বাসকারি যাযাবর গোষ্ঠী হিসেবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত টিকে থাকা বেদে সম্প্রদায়ের আবার উল্টো রীতি। বেদেরা তাদের মেয়ে-বউ-সাপ-মাছ সবকিছুকে নিয়ে একসাথেই নৌকায় বাস করে।

.

যদিও জেলেরা নিজের নৌকায় মেয়ে উঠায় না- তবুও শরীরের কামনায় কখনো কখনো তারা বেদেদের নৌকায় হামলা করে। চাঁন মাঝির মত অনেক পুরানো মাঝি সাগরের বুকে এমন লুট-ডাকাতি করে। মহাজনেরা এসব জানলেও তাদের ইকো সিস্টেমে বাঁধা দেয় না। ‘হাওয়া’ মুভির ব্যাকড্রপে এই পটভূমিটা জানা থাকলে দর্শক অনেক কিছু বুঝতে পারবেন।

.

সাগরে মাছ ধরে জেলেরা জীবিকা নির্বাহ করে। অন্যদিকে সাগরের মাছেদের রক্ষার জন্য আছে মৎস্য দেবী। এই দেবীরা কুহকিনী হয়ে নানা রূপে জেলে নৌকায় উঠে। এই কুহকিনী জেলেদের জাল কেটে দেয়; মাছেদের নৌকা থেকে দূরে রাখে। অনেক সময় দেখা যায়, আশেপাশের সব নৌকা সাগরের এক জায়গায় মাছ পাচ্ছে। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি নৌকা মাছ পাচ্ছে না। তখন জেলেরা বিশ্বাস করে তাদের নৌকায় প্রেত উঠেছে।

.

বঙ্গোপসাগরের জেলে ও বেদে সম্প্রদায় নিয়ে এই দুটি প্রচলিত কাহিনী বা লোকমুখে চলা গল্প খুব বড় প্রভাব রেখেছে ‘হাওয়া’ মুভির গঠন বিন্যাশে। কিন্তু ডিরেক্টর ইচ্ছে করেই দর্শকদের মুখে তুলে গল্পটা খাইয়ে দেননি। ক্লাইম্যাক্স দেখে সেজন্য কিছু মানুষকে আমি হতাশ হতে দেখেছি। আরেকটা বিষয় হল- মুখের ভাষা। জেলেদের মুখ দিয়ে শ্রতিমধুর বাণী যে বেরুবে না তা তো স্বাভাবিক। কিন্তু ‘তুমি বন্ধু সাদা পাখি’ গানের ভাইরালে ভেসে যারা বাচ্চাকাচ্চা সহ ‘হাওয়া’ দেখতে এসেছেন তারা বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন কিছু গালিগালাজময় দৃশ্যে।

গল্পকার ও পরিচালক ‘হাওয়া’ মুভির মধ্য দিয়ে সূহ্মভাবে মানুষের ষড়রিপুকে তুলে ধরেছেন। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য – মানুষের নেতিবাচক এই ৬টি রিপুর নানা ইঙ্গিত ও দৃশ্য পুরো হাওয়া মুভিজুড়ে বিদ্যমান। স্পয়লার হয়ে যাবে বলে দৃশ্য ধরে ধরে আলোচনা করছি না। তবে সচেতন শিক্ষিত দর্শক মুভি দেখার সময় বুঝে নিবেন।

হাওয়া (Hawa) 2022 Full Bangla Movie Review

আফসোস, চঞ্চল চৌধুরী এই পোড়ার দেশে জন্মালেন বলে বিশ্ব সিনেমা ইতিহাসে অমর হলেন না। কিন্তু যদি কোনভাবে আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে চঞ্চল চৌধুরীর হাওয়া’র পারফর্মেন্সকে পৌঁছানো যায় কি যে খুশি হতাম। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধুমাত্র দাঁত বের করে হাসি দিয়ে কিভাবে অন্তরাত্মা কাঁপানো যায় খুব ভাল করে দেখিয়েছেন তিনি। চিৎকার করে গলা ভেঙ্গে ফ্যাঁসফেঁসে কন্ঠে পুরোটা মুভি জুড়ে যেমন দাঁপিয়ে গেছেন তা সমীহ জাগানিয়া। বাকি অভিনেতাদের মধ্যে শুধুমাত্র নাসের খান তাঁর লেভেলে পারফর্ম করেছেন।

.

সবশেষে বলব মিউজিক নিয়ে। “সাদা পাখি কালা পাখি” নিয়ে আর কিছু বলার মত বাকি নেই। তবে বড় স্ক্রিনে যখন খেয়াল করেছি কোনরকম আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার ছাড়া’ কলসি, বাটি, চামড়া ও নৌকার খোল ইত্যাদির তালে গানটি রেকর্ড করা হয়েছে আবহকার ইমন চৌধুরীর উপরে সম্মান বেড়েছে। এছাড়া ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর পুরো মুভির টোন ঠিক রাখতে খুব কাজে দিয়েছে। যখন মুভিটা ঠিকমত শুরুও হয় নি; স্টিমার ছাড়া মাত্রই গোঙ্গানির মত করে সমস্বরে একদল নারী কন্ঠে “আইয়ো গো আইয়ো গো”বলে পিলে চমকে দিয়েছিলো।

.

যাই হোক, সবলিমিয়ে আমার কাছে ‘হাওয়া’ একটা দৃষ্টান্ত স্থাপনকারি সিনেমা আমাদের জন্য। ‘মনপুরা’র মত একেবারে মাসি নয়; আবার ‘অজ্ঞাতনামা’র মত একেবারে ক্লাসি নয়। ক্লাস ও মাসের মিশ্রনে সুস্বাদু একটা মুভি ‘হাওয়া’। আশা করি কেউ পাইরেসি করবেন না। বৈধ পথে বাংলা সিনেমার পাশে থাকবেন।

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.